আলভী মাহমুদ আলিফ প্রতিনিধি :
তুরাগ নদী থেকে উদ্ধারকৃত অজ্ঞাতনামা বস্তাবন্দী লাশের পরিচয় শনাক্তসহ চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত হানিট্র্যাপ ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার, লুণ্ঠিত প্রাইভেটকার ও মোবাইল ফোন উদ্ধার এবং আদালতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নিহত মোঃ লোকমান সরদার (৩৮) পেশায় একজন উবার ও পাঠাও চালক ছিলেন। গত ৩০ মে ২০২৬ খ্রি. বিকেল আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিটে তিনি কুড়িলের বাসা থেকে ভাড়ায় প্রাইভেটকার চালানোর উদ্দেশ্যে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। পরবর্তীতে গত ১ জুন দক্ষিণখান থানা ও নৌ পুলিশ ফায়দাবাদ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদী থেকে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দী একটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের হাত-পা ভাঙা এবং শরীর অত্যন্ত নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত ছিল। পিবিআই টিম তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় লাশটি নিখোঁজ লোকমানের বলে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ফারজানা আক্তার বাদী হয়ে দক্ষিণখান থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-০১, তারিখ-০২/০৬/২০২৬ খ্রি.) দায়ের করেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, আসামী সালমানের কথিত স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আর্নিবা জারা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী চালক লোকমানকে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন পাখির বাজার এলাকার হোন্ডা রোডে ডেকে নেয়। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা চক্রের সদস্য সালমান, মোঃ আদিব ইসলাম (১৯), রাকিব ও মোঃ সবুজ মিয়াসহ আরও কয়েকজন লোকমানকে অবরুদ্ধ করে। মাদক সেবনের অপবাদ দিয়ে ও মুক্তিপণ হিসেবে তাঁর কাছ থেকে ১০,০০০ টাকা আদায় করে তারা। এরপর নির্মমভাবে পিটিয়ে তাঁর হাড়গোড় ভেঙে হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদীতে ফেলে দেয় এবং তাঁর চালিত প্রাইভেটকারটি (ঢাকা মেট্রো-গ-২৮-১৬৬৮) নিয়ে আসামীরা আত্মগোপনে চলে যায়।

মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) স্ব-উদ্যোগে এর তদন্তভার গ্রহণ করে। পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল ঢাকার উত্তরা, তুরাগ, দক্ষিণখান, গাজীপুরের টঙ্গী, গাছা এবং কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় দীর্ঘ অভিযান পরিচালনা করে আসামিদের গ্রেফতার করে। কক্সবাজারের কলাতলী এলাকা হতে আসামী আদিব ইসলামকে, খিলক্ষেত পূর্ব নামাপাড়া এলাকা হতে আসামী মোঃ এস এম সালমান ও জান্নাতুল ফেরদৌস মীমকে এবং টঙ্গী পশ্চিম থানার পাখির বাজার মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোঃ সবুজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৪ জুন গাজীপুরের গাছা থানার পশ্চিম ঝাঝর এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় লুণ্ঠিত প্রাইভেটকারটি উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে প্রধান আসামী এস এম সালমান আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের নাম প্রকাশ করেছেন।
পিবিআই জানায়, এই চক্রটি কথিত স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নেয়। পরবর্তীতে ভাই, বোন বা বন্ধু পরিচয়ে টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের বাসায় ডেকে এনে দেহব্যবসা ও মাদক সেবনের প্রলোভন দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয়। সাধারণত উঠতি বয়সী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং চালকদের তারা টার্গেট করত। এই ধরনের হানিট্র্যাপ চক্র হতে সর্বসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পিবিআই।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
