ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সংকটের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে আপাতত স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজার। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী নয়; বরং এটি ‘ঝড়ের আগের শান্তাবস্থা’। চীনের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড পরিমাণ তেল রপ্তানির কারণেই বর্তমানে বাজারে ভারসাম্য বজায় রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তবে এত বড় সংকটের পরও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম বর্তমানে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১০ ডলারে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রসহ আটলান্টিক অঞ্চলের উৎপাদক দেশগুলো রপ্তানি বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণ করছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জরুরি তেল মজুত থেকেও রেকর্ড পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীন। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশটি যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কেপলারের শিপিং তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে চীনের সমুদ্রপথে দৈনিক তেল আমদানি ছিল ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল, যা এপ্রিলে কমে ৮ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। চলতি মে মাসে তা আরও কমে ৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়াতে পারে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বিশাল তেল মজুত থাকায় দেশটি আপাতত আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে চীন ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে এপ্রিল মাসে তেল আমদানি প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল এসব দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকা থেকে বিকল্পভাবে তেল আমদানি করছে। এর ফলে এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি রেকর্ড ৮ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে এবং মে মাসে তা ১০ মিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষক রন বুসো সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান স্থিতিশীলতাকে স্থায়ী মনে করলে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের মোট তেলের মজুত প্রায় ২৪৬ মিলিয়ন ব্যারেল কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল শুরু হলে জ্বালানির চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। তখন বিশ্ববাজারে নতুন করে তেল মজুতের প্রতিযোগিতা শুরু হলে বর্তমান সংকটের প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠবে।
