দুই দশক আগের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার অর্থনীতির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অর্থনীতির আকার বড় হলেও এর ভেতরে কাঠামোগত দুর্বলতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে আসে ৪.২২ শতাংশে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৭৩ শতাংশে। শিল্প ও কৃষি খাতেও প্রবৃদ্ধি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
তিনি কর্মসংস্থানে কাঠামোগত সংকটের কথাও তুলে ধরে বলেন, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় অনেক মানুষ কৃষিখাতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, ফলে উৎপাদনশীলতা কমেছে এবং ছদ্ম-বেকারত্ব বেড়েছে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, সঞ্চয় কমে যাওয়ায় বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যা বহিঃখাতে চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
মুদ্রা সরবরাহ ও ঋণপ্রবাহের ক্ষেত্রেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে বলে তিনি জানান। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগে মন্থরতা দেখা দিয়েছে।
রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিডিপির অনুপাতে রাজস্বের হার স্থির থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি বেড়েছে। পাশাপাশি মেগা প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন ও সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
বহিঃখাতের ক্ষেত্রে রপ্তানি-আমদানি ও রেমিটেন্স বেড়েছে, তবে একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি হুন্ডি ও অর্থপাচারকেও এ ক্ষেত্রে দায়ী করেন।
আয় বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার কথাও তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাও এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং দুর্বল তদারকির কারণে আর্থিক খাত ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, করব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়া ‘জম্বি’ প্রকল্প বাতিল, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে নতুন অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সবশেষে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্য থাকবে টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
