মোসাদ্দেক বিল্লাহ আবির:
দেশের ৬০০ জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের বাথরুম, টয়লেট ও অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব সাংবাদিকদের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার উপপরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী। বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টটি মুছে ফেলার পর তিনি নতুন আরেকটি পোস্টে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তবে তার সেই ব্যাখ্যাও নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বুধবার সকালে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শাফী লেখেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা করে তথ্য মন্ত্রণালয় ও সাংবাদিকদের দেশের ৬০০ জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের বাথরুম, টয়লেটসহ হাসপাতাল ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব অন্তত এক অর্থবছরের জন্য দেওয়া যেতে পারে। তারা সফল হলে স্থায়ীভাবেও দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিক সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সমালোচনার মুখে কিছু সময় পর তিনি পোস্টটি মুছে ফেলেন।
এরপর দ্বিতীয় এক পোস্টে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ডা. শাফী দাবি করেন, হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে জনমনে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু সাংবাদিকরাই এসব ব্যর্থতা তুলে ধরছেন, সেহেতু তাদের হাতে দায়িত্ব দিলে হয়তো কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
নিজের ব্যাখ্যায় ডা. শাফী উল্লেখ করেন, দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল পুরোনো ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী পর্যন্ত ভর্তি থাকেন। রোগীর স্বজনদের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরিচ্ছন্নতা রক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, হাসপাতাল ভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মেরামত বা সংস্কার কাজ সময়মতো সম্পন্ন করে না। অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের অসচেতনতার কারণেও টয়লেট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা কেন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে উপস্থাপন করবেন। সমালোচকদের মতে, গণমাধ্যমের কাজ হলো রাষ্ট্রীয় সেবার দুর্বলতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জনদুর্ভোগের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা। সেই দায়িত্ব পালনের কারণে সাংবাদিকদের পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাদের মতে, অনিয়ম ও ব্যর্থতার সংবাদ প্রকাশকে দায়িত্ব গ্রহণের যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বরং এটি সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার জানা নেই। বিতর্কিত ফেসবুক পোস্ট কিংবা পরবর্তী ব্যাখ্যামূলক স্ট্যাটাস সম্পর্কেও তিনি অবগত নন বলে জানান।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংবাদিক মহল এবং স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিক সমাজের দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন মন্তব্যের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর টেকসই সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
