উম্মে সালমা,স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর শাহজাহানপুরে হাফেজ মোঃ ফাহিমুল ইসলাম (২৬) নামে এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করলেও নিহতের পরিবার এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিহত ফাহিমুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে শাহজাহানপুর থানাধীন শান্তিবাগ বাজার রোডের ২৫/৩ নম্বর ভবনে তার মালিক দেব শঙ্কর মাতার ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। তিনি বিমানবন্দরে একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান (বুশরা সিকিউরিটি সার্ভিস)-এ কর্মরত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাহিম ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ। তিনি কাঁচকুড়ার জামিয়া শায়েখ জাকারিয়া মাদ্রাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করেছিলেন এবং একজন কুরআনের হাফেজ ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে দেব শঙ্কর মাতা নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে ফাহিমের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরির সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেব তার বিভিন্ন কাজেও ফাহিমকে ব্যবহার করতেন। তবে মৃত্যুর আগে ফাহিমের মধ্যে কোনো ধরনের মানসিক অস্থিরতা বা আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়নি বলে দাবি পরিবারের।কারণ ফাহিম জন্ম দিন উদযাপন নিয়ে অনেক পরিকল্পনা রেখেছিলো দাবি করেছেন ফাহিমের মা পারুল বেগম।সন্ধ্যায় তারা একসাথে সবাই মিলে কেট কাটার কথা ছিলো।
গত ৫ জুন শান্তিবাগে দেবের ফ্ল্যাট থেকে হাফেজ মোহাম্মদ ফাহিমুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করে শাহজাহানপুর থানা পুলিশ। পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করলেও নিহতের পরিবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি দ্রুত আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া এসআই সিয়াম ময়নাতদন্তের কথা বলে ফাহিমের মা পারুল বেগমের কাছ থেকে একটি অপমৃত্যু সংক্রান্ত আবেদনে স্বাক্ষর নেন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা।
ফাহিমের মা পারুল বেগমের দাবি, শাহজাহানপুর থানার এসআই সিয়াম তাকে জানিয়েছেন যে ফাহিমের দুটি মোবাইল ফোন তার কাছে রয়েছে। তবে পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলে তিনটি মোবাইল ফোন পাওয়া গিয়েছিল।এবং ভিডিও ফুটেজে এসব কিছুর সত্যতা পাওয়া গিয়েছে।
এ বিষয়ে এসআই সিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। ফলে তৃতীয় মোবাইল ফোনটি মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দেব শঙ্কর মাতার ভাষ্যমতে, ঘটনার আগে ফাহিম ভিডিও কলে তাকে গলায় ফাঁস দেওয়ার প্রস্তুতির দৃশ্য দেখিয়েছিলেন। বিষয়টি দেখতে পেয়ে তিনি সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন বলে দাবি করেন।
তবে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ৯৯৯-এ কল করার পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় নেয়। তাদের প্রশ্ন, যেখানে ঘটনাস্থল থেকে শাহজাহানপুর থানার দূরত্ব মাত্র কয়েক মিনিটের, সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতে এত বিলম্ব কেন ঘটল?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করা প্রয়োজন ছিল। তবে ফায়ার সার্ভিসকে কোনো কল করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়েও এলাকায় আলোচনা চলছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে স্বজনরা দাবি করেন, ফাহিমের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে দেব শঙ্কর মাতাকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে দেব শঙ্কর মাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দেব বলেন, “আপনারা শাহজাহানপুর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।” তবে পরিবারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রশ্নের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা, ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব এবং ঘটনার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে শাহজাহানপুর থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিহতের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়রা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুসন্ধান করছে সত্যের কণ্ঠ। পরবর্তী পর্বে উঠে আসবে নতুন তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, তদন্তের অগ্রগতি এবং ঘটনার নেপথ্যের আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সঙ্গে থাকুন সত্যের কণ্ঠের অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনে।
