নিজস্ব প্রতিনিধি :
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-কে ঘিরে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্ফোরক অভিযোগ। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক মোঃ আব্দুল খালেককে কেন্দ্র করে নানা গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এ ক্যাশিয়ার পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের সহায়তায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ৩৭ বছর বয়সে সরকারি বিধি-বিধান উপেক্ষা করে জামুকায় সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পান আব্দুল খালেক। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি একটি প্রভাববলয় গড়ে তুলে বিভিন্ন অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া সনদ প্রদান এবং এর বিনিময়ে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ করা হয় এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় বিভাগীয় কার্যক্রমও শুরু হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং শাস্তিস্বরূপ তার বেতন স্কেল ৫৩,০৬০ টাকা থেকে কমিয়ে ২২,০০০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়, যা তিন বছরের জন্য ক্রমপুঞ্জীভূতভাবে কার্যকর ছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রশাসনিক শাস্তি তার কার্যকলাপে প্রত্যাশিত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে বরং অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে তার অনিয়ম আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও সুসংগঠিত রূপ নেয়। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন, যা নিকট আত্মীয় বা ভিন্ন পরিচয়ের আড়ালে সংরক্ষিত রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তিনি চরম গোপনীয়তা অবলম্বন করেন।
৭ নভেম্বর ২০২৪ ইং তারিখে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সচিব বরাবর একাধিক প্রামাণ্য নথিসহ লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এছাড়াও ২২ এপ্রিল ২০২৫ ইং তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, ভুয়া সনদ প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় কেন আইনগত ব্যবস্থা, নিলেন না কারণ সবাই একটি সুতোই গাথা।
পরবর্তীতে জামুকার মহাপরিচালকের নিকট পুনরায় অভিযোগ দাখিলের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৭ জুন একটি শুনানির আয়োজন করা হয়। তবে শুনানিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উপস্থিত না রেখে একতরফাভাবে বক্তব্য গ্রহণ করায় তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাদী ও বিবাদীকে মুখোমুখি না করে এ ধরনের শুনানি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে যৌক্তিক সংশয় সৃষ্টি করে।
এদিকে, গণমাধ্যমকর্মী মরিয়ম আক্তার মারিয়া অভিযোগ করেছেন, তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি আব্দুল খালেকের অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অশালীন ভাষার শিকার হন। তার আরও অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তার নির্দেশে দপ্তরের পিয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াও পরিচালিত হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যে, “কেঁচো খুঁজতে গিয়ে বড় বড় সাপ বেরিয়ে আসছে”—যা ইঙ্গিত করে, তদন্তের গভীরতা বাড়লে আরও বিস্তৃত অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হতে পারে। তাদের দাবি, জামুকার কিছু পদ যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’-এর ন্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে স্বল্প সময়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, চলমান অনুসন্ধানকে আরও বিস্তৃত ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা হলে কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
